
যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর ইতিহাসে সাহিত্য হয়ে উঠেছে সংস্কার ও আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীতে হাজারো ভাষা। লাখো জাতি কোটি কোটি বছরের পৃথিবীর ইতিহাস। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ভাষা তার নিজ নিজ ভূখণ্ড। ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত। যে যেই দেশের বা জাতির তার ভাষা সে দেশের।
পৃথিবীতে মানুষ ভাষা এনেছেন। একে অন্যের সাথে কথা বলতে বা শব্দের আদান-প্রদানের জন্য ভাষা জানা জরুরি। যে যেই দেশের নাগরিক তার ভাষা সে দেশীয়। উপমহাদেশে বাংলা-উর্দু-হিন্দি-ফারসি ভাষার পাশাপাশি আরও অনেক ভাষা রয়েছে আর ভাষা সাহিত্যের উপর রয়েছে বিখ্যাত কবি লেখকদের নাম। যাদের সাহিত্য রচনায় পৃথিবীতে জ্ঞানীগুণীরা পিএইচডি করে। কবি লেখকদের নামে পৃথিবীর অনেক দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন কবি বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন ভাষা। তবে সাহিত্যের স্তরগুলো অনেকটা গভীর সমুদ্রের মতো কেউ ডুব দিতে চাইলে। জানতে হবে সাঁতার। আর সাঁতার জানা সহজ কাজ নয়। অসাধ্য সাধন। পৃথিবীর যুগে যুগে কবি লেখকদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল। যে তারা লেখার মাধ্যমে বেঁচে থাকতে চায়।
মনে করেন যে আমরা ছোটবেলা পাঠ্যপুস্তকে যে কবিতা, ছড়া, গল্প পড়তাম তার রচনাকাল ১৯ শতক বা কোনটা ১৮ শতক। অথচ আমরা পড়ছি বিংশ শতাব্দীতে। আমরা চিনি, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ বা তাদের পরবর্তী সময়ের কবি লেখকদের। মোটামুটিভাবে বলা যায় যে ১৭-১৮ বা ১৯ শতকের কবি লেখকদের আমরা চিনি ২০০০ সাল বা তার আগে থেকে। উনারা কেউ বেঁচে নেই। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ বা অন্যান্যরা কেউ বেঁচে নেই তবে তাদের লেখা বেঁচে আছে সাহিত্য বেঁচে আছে।
উনাদের নিয়ে আলোচনা আছে তবে সাহিত্য সমালোচনা খুবই কম। বর্তমান সময়ে বাংলা সাহিত্যের পাঠক সংকট রয়েছে। কেউ এখন ঠিকমতো পড়াশোনা করে না। উচ্চশিক্ষিত একশ্রেণীর কবি লেখকদের দেখা যায় উনারা তরুণদের অনুৎসাহিত পাশাপাশি খুব তীব্র সমালোচনা করে থাকেন।
অনেক প্রবীণ লেখকদের দেখা যায় যে উনারা রাজনৈতিক দলের হয়ে পদ পদবি ভাগিয়ে নিয়েছেন। এখানে রাজনীতি আর সাহিত্য মিলেমিশে একাকার। মুখে নজরুল, রবীন্দ্রনাথ থাকলেও বাস্তবে সাহিত্য আছে পৌরাণিক কোন গল্প কাহিনীতে। ফুল, ফল, লতা পাতা আর আমি তুমি শব্দের ব্যবহার। বয়সে বড় হওয়া আর অতীতের কিচ্ছা কাহিনী। সাহিত্যের আলোচনা এখন মিথ্যে প্রশংসা আর আয়োজকদের মন রক্ষা করার লড়াই।
সাহিত্যের বর্তমান তরুণদের ভিতর নজরুল, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের চেয়ে উনাদের ব্যক্তিগত জীবন আর সময়ের সাথে নজরুল, রবীন্দ্রনাথ হতে না পারার কষ্ট চরম। অনেকটা অসহায়ত্ব আর দারিদ্র্যতার কষাঘাতে জর্জরিত তরুণ প্রজন্ম কবি লেখক হতে চায় না। সেকালের সাহিত্যের পরবর্তী সময়ের হাজারো রচনা এখন শুধুমাত্র ফেসবুক পোস্টে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তবে ব্যতিক্রম হতে পারতো। যদি লেখক লেখালেখির পাশাপাশি পড়াশোনা করতো আর বইমেলায় একজন কবি অন্য কবিদের বইগুলো সংগ্রহ করে আলোচনায় অংশ নিতে পারতো। আমি বইমেলায় বাংলাদেশের বিশিষ্টজনদের লক্ষ্য করে দেখেছি। উনারা বই কিনে পড়ে না। অনেক কবি লেখক বইমেলার মুক্তমঞ্চে বা মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অংশ নেয় লেখকের বইটি ফ্রি নিয়ে যাওয়ার জন্য (সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলা নয়) মূলতঃ পাঠক সংকটের এটি ও একটি কারণ।
যারা সারাবছর বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। তারা কে কেমন লিখে থাকেন তা পাশে থাকা কবি লেখকরা অবগত আছেন। আজকাল সাহিত্যের দূরদশার পিছনে কবি লেখকদের অংশগ্রহণ রয়েছে। অনেক কবি লেখক তার জীবনের বড় অংশে নারী আর ফুল পাখির বাইরে কিছুই লিখতে শিখেননি।
অনেক কবিতা, ছড়া পড়তে গেলে দেখা যায় যে সেকেলে ভাব মনে হয় নজরুল, রবীন্দ্রনাথেরই লেখা অথচ আমরা দেখতে পাই ১৮ শতকের কবি ও সাধক লালন শাহ্, পাঞ্জু কানাই বা সৈয়দ শাহ্ নুর উনাদের লেখা কত আধুনিক আর বাস্তবসম্মত। জীবনানন্দ দাশের কবিতা পাঠ করলেও আধুনিক যুগের কবি বা কবিতা কেমন হতে পারে তা উদাহরণ হিসেবে বলা যায়।
“আমার এই গান শুনবে না তুমি এসে আজ রাতে আমার আহবান ভেসে যায় দূরের বাতাসে” বা কবির সুরঞ্জনা কবিতার আহবান শুনলে যে বার্তা পাওয়া যায় তা হৃদয়ের স্পন্দন শুনতে পাই। “ঐখানে যেও নাকো তুমি বলোনা কো কথা ঐ যুবকের সাথে কি এমন কথা তার সাথে তোমার সাথে” বা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম উনার লেখা একটি গানে প্রেয়সীর প্রতি যে আবেগ তুলে ধরেছেন। তা অসাধারণ “ফিরিয়া যদি সে আসে আমারি খোঁজে ঝরা গোলাবে আনিয়া সমাধি পাশে আমার বিদায় বাণী শুনাবে”
বর্তমান সময়ের অনেক কবির কবিতার শব্দ দুর্বোধ্য। অনেকেই আছেন সখের কবি। টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে পদ পদবী ও ক্রেস্ট নিয়ে রেখেছেন। এবং মিডিয়ার সামনে নিজেকে বড় কবি হিসেবে জাহির করতে পছন্দ করে থাকেন। তবে কেউই হেলাল হাফিজ না যে লিখে ফেলবেন। “এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”
এখন কবিদের ভেতরে লোভ আর ক্ষমতার লড়াই দেখা যায়। সাধারণ মানুষ থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন যে কবি লেখকদের থেকে সাধারণ মানুষ আলাদা হয়ে গেছে। মানুষ অনেক কবি লেখকদের অন্য গ্রহের মনে করে বা আদিমকালের চিন্তা চেতনার মনে করে। তবে সাহিত্য গণ মানুষের পক্ষে হতে পারতো। সাহিত্যিক হতে পারতেন আদর্শিক নেতৃত্ব। সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারতেন কবি লেখকরা। সাহিত্যের উন্নয়ন হতো ভালো লেখা। ভালো আলোচনা। তবে সাহিত্য সমালোচনার বাইরে নয়। গঠনমূলক সমালোচনা সাহিত্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারে।