রাজশাহী প্রতিনিধি : Rajshahi Development Authority’র সহকারী প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামানকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারীর সঙ্গে তার কথিত আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর আলোচনায় উঠে এসেছে নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং এবং নারী কেলেঙ্কারির পুরোনো অভিযোগগুলোও।
বৃহস্পতিবার ২ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এর পরপরই আলোচিত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পূর্বের বিভিন্ন অভিযোগ আবারও সামনে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালের ১৬ আগস্ট আরডিএ ১০টি পদের বিপরীতে ১১ জন নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে আবেদন করেন শেখ কামরুজ্জামান। লিখিত পরীক্ষার পূর্ণমান ছিল ১০০ এবং ন্যূনতম পাস নম্বর ছিল ৩৩। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি লিখিত পরীক্ষায় মাত্র ২৪ নম্বর পেয়ে অকৃতকার্য হন। এরপরও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তাকে চাকরি দেওয়ার উদ্দেশ্যে লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে কেবল মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। অথচ লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অনেক প্রার্থী ছিলেন বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী। অন্যদিকে শেখ কামরুজ্জামানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি এবং পরে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা।
নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীরা ২০১১ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ অভিযোগ দায়ের করেন। তদন্ত শেষে একই বছরের ১৭ জুলাই মামলা করা হয়। পরে ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়। ওই মামলায় শেখ কামরুজ্জামান ছাড়াও আরডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান এবং সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রব জোয়ার্দ্দারকে আসামি করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, ২০০৪ সালে চাকরিতে যোগদানের পর থেকে ২০১৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত শেখ কামরুজ্জামানের বৈধ আয় ছিল ৪৯ লাখ ৩৩ হাজার ১৫২ টাকা। কিন্তু তার নামে ও বেনামে রাজশাহী, ঢাকা ও কুষ্টিয়ায় বিপুল পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, তার সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজশাহীর পবা এলাকায় একাধিক প্লট, চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকায় জমি, ঢাকার মিরপুরে ফ্ল্যাট, কুষ্টিয়ায় জমি ও বাড়ি, এবং কাদিরগঞ্জে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূল্যের দুটি ফ্ল্যাট।
২০২২ সালের জুনে দুদক শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে পৃথক মামলা দায়ের করে। ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশে স্বামী-স্ত্রীকে কারাগারে পাঠানো হয়।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, নিশাত তামান্না তার সম্পদ বিবরণীতে ২৬ লাখ ১৭ হাজার টাকার সম্পদ দেখালেও যাচাই-বাছাইয়ে ৫৬ লাখ ৯১ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এতে প্রায় ৩০ লাখ ৭৪ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়।
এদিকে রাজশাহীর জেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটি চলমান দুটি দুর্নীতির মামলাকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক হিসেবে উল্লেখ করে আইন মন্ত্রণালয়-এ মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ পাঠিয়েছে। তবে দুদকের রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল বারী জানিয়েছেন, মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে দুদকের কাছে কোনো মতামত চাওয়া হয়নি।
দুদকের মামলা দায়েরের পর শেখ কামরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও পরে আদালতের স্থগিতাদেশ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি পুনরায় চাকরিতে যোগ দেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
ভাইরাল ভিডিও প্রসঙ্গে শেখ কামরুজ্জামান দাবি করেছেন, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। তার ভাষ্য, “আমার সম্মানহানি ও সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে একটি চক্র এ ভিডিও ছড়িয়েছে। এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”
তবে কয়েকজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ভিডিওটি পর্যালোচনা করে এটি এআই-নির্মিত নয় বলে মত দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আরডিএ’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, বিষয়টি তার নজরে এলে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, যেহেতু দুর্নীতির মামলাগুলো বিচারাধীন, তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
নিয়োগে অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং, নারী কেলেঙ্কারি এবং ভাইরাল আপত্তিকর ভিডিও—সব মিলিয়ে শেখ কামরুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও মামলা থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে এখনও প্রভাবশালী অবস্থানে বহাল আছেন, তা নিয়ে সচেতন মহলে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।